নয়াকৃষির জ্ঞান ও কাযক্রম পর্যালোচনা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা শীষক' প্রশিক্ষণ
টাঙ্গাইল জেলার দেলদুয়ার থানার আটিয়া ইউয়িনের মৌসাকাঠালিয়া এবং গড়াসিন গ্রামের নারী কৃষক, পুরুষ কৃষক ২১জনকে নিয়ে “নয়াকৃষির জ্ঞান ও কাযক্রম পযালোচনা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা শীর্ষক প্রশিক্ষণ” অনুষ্ঠিত হয়। প্রশিক্ষণ সভাপতিত্ব করেন উবিনীগের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জনাব ফরহাদ মজহার এবং সহ সভাপতি ছিলেন উবিনীগের নির্বাহী পরিচালক ফরিদা আখতার। অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন উবিনীগের ব্যবস্থাপনা পরিষদের সদস্য সীমা দাস সীমু। এছাড়াও সভায় উপস্থিত ছিলেন নয়াকৃষির কৃষক, উবিনীগ টাঙ্গাইল কেন্দ্রের সমন্বক রবিউল ইসলাম চুন্নু এবং কর্মী ফাহিমা খাতুন লিজা, রজব আলী, বরকত হোসেন, হাসান আল শরিফ, আবু হানিফসহ প্রশিক্ষণে মোট ৩১ জন অংশগ্রহণ করেন। স্থান: বিষ্ণুপুর বিদ্যাঘর, পাথরাইল, দেলদুয়ার, টাঙ্গাইল। তারিখ: ২৪ মে, ২০২১।
প্রশিক্ষণের বিষয়াবলী :
১. নয়াকৃষির চিন্তা কোথা থেকে আসছে এবং কেন আমরা এখনও নয়াকৃষি করে যাচ্ছি?
২. জলবায়ু পরিবর্তন ও করোনা নিয়ে আলোচনা
৩. নতুন কাজের ধরন কি হতে পারে? বন্যা জলাবদ্ধতার জন্যে স্থানীয় সরকারের সাথে কাজ, বন্যা - খরার কারণে কি কি বীজ হারিয়েছে, সেই হারিয়ে যাওয়া বীজ উদ্ধারের পারকল্পনা?
৪. সব আলোচনা ও পরিকল্পনা চুড়ান্ত করা।
প্রথম অধিবেশন
ক. রেজিষ্ট্রেশন ও আসন গ্রহণ: প্রশিক্ষনের শুরুতে সকলে রেজিষ্ট্রেশন করে নিজ নিজ আসন গ্রহণ করেন।
খ. স্বাগত বক্তব্য ও উদ্বোধন: প্রথমে বক্তব্য রাখেন উবিনীগের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জনাব ফরহাদ মজহার। তিনি বলেন, প্রতিটি প্রাণের আবাস নষ্ট হয়ে গেলে যে বিশৃঙ্খলা দেখা দেয় তখনই সমস্যা হয়, মানুষ পরিবেশের প্রতিটা উপাদানকে এমনভাবে পরিবর্তন করেছে যে প্রাণীকুলের আবাস নষ্ট হচ্ছে। ফলে অনুজীবসমূহ বন্য পরিবেশ থেকে মানব কুলে ছড়িয়ে পড়ে প্রাণঘাতী রোগের সৃষ্টি করছে। বহু গুরুত্বপূর্ণ উপকারী প্রাণী পরিবেশ থেকে হারিয়ে যাচেছ। বড় বড় কোম্পানীগুলো আমাজন বন ধ্বংস করছে। ফলে প্রকৃতির ভারসাম্য ভেঙে পড়েছে। কৃষক প্রকৃতির সঙ্গে যুক্ত। এ ছাড়া উক্ত বক্তব্যে প্রতিটা কৃষককে আবিষ্কারক কর্তা এবং প্রাতটি কৃষক পরিবারকে বিজ্ঞানচর্চার কেন্দ্র বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে । বক্তা “নয়াকৃষি হলো বাঁচার একমাত্র উপায়” উদ্ধৃতিতে নয়াকৃষি উৎপাদিত কৃষিপণ্যের উচ্চ পুষ্টিমাণ ও উৎকৃষ্ট গুণাগুণের দাবী করে দ্রুতগতিতে আমাদের রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতাকে শক্তিশালী করে।
সমাজে কৃষি সম্পর্কে প্রচলিত ভ্রান্ত ধারনাগুলো হলো- কৃষি কেবলই গ্রামের অশিক্ষিত পশ্চাৎপদ মানুষের অলাভজনক খাদ্য উৎপাদনকারী পেশা এবং কৃষিকে ধ্বংস করে শহর গড়াই হলো আধুনিকতার প্রতিক।
জনাব ফরহাদ মজহার আবাস শব্দটাকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন, করোনা ভাইরাস SARS COV-2 নামে অথবা এর ধারাবাহিক রূপে বন্যপ্রাণীদের মাঝে পূর্ব থেকেই স্বাবাবিকভাবেই বিদ্যমান ছিলো, কিন্তু যখন থেকে আমরা সেই বন্য প্রাণীর আবাস নষ্ট করছি তখন সেই বন্যপ্রাণীরা মানব বসতিতে প্রবেশ করছে ও বিভিন্ন অনুজীবের সংক্রমন বাড়ছে, ফলস্বরূপ আজকের করোনা মহামারী।
জীববৈচিত্র্য এবং তার বাসঃস্থান রক্ষাই হলো প্রাণীকুলের জীবন ধারন অক্ষুন্ন রাখার অন্যতম উপায়। তাই এই পরিবেশে প্রতিটি প্রাণের আবাস সমুন্নত রাখতে হবে।
নয়াকৃষি কোন টেকনোলজি বা প্রযুক্তি না, আমরা কখনো বলি নাই এই সার, বিষ, বীজ নিন, এখন আপনারা কৃষি কাজ করেন। আমরা সবসময় আপনাদের কাছ থেকে শিখতে এসেছি এবং এভাবেই এই নয়াকৃষি আন্দোলন সারাদেশে ছড়িয়ে যাবে ও শক্তিশালী হবে। তিনি আরো বলেন, আজকের কর্মশালা পরিচালনা করবেন উপস্থিত কৃষকেরা।
তারপর তিনি কৃষকদের কাছে প্রশ্ন রাখলেন কৃষি কাকে বলে? প্রতি উত্তরে উপস্থিতির মাঝে গড়াসিন গ্রামের কৃষক নাজিম উদ্দিন বলেন, ফসল বুনা ও আবাদ করাকেই কৃষি কাজ বলে। মৌশাকাঠালীয়া গ্রামের রূƒপসী বেগম বলেন, ফসল আবাদের পাশাপাশি পশুপাখী পালন ও পরিবেশের অন্যান্য উদ্ভিদ কুলের রক্ষাকে কৃষিকাজ বলে। তিনি এ সম্পর্কে একটি শ্লোক বলেন-“ক্ষেতের কণা, বাণিজ্যে সোনা”।
আমাদের পূর্বপুরুষেরা ১৫০০০ প্রজাতির ধান চাষ করতো, সেখানে ধান কম হতো কিন্তু খড় বেশী হতো, তবে কি আমাদের পূর্বপুরুষেরা বোকা ছিল? না, তারা কৃষি কাজটা এমনভাবে করতো যে অন্যান্য প্রাণীর খাবারের ব্যবস্থা করা যায়। বাল্য কালে কৃষি কাজ বলতে মাছ চাষও বুঝানো হতো। তাই বিলে পানি আসলে কৃষকেরা খুশি হতেন। কিন্তু কালের পরিক্রমায় সেই বিলের জায়গায় রাস্তা হয়েছে। ফলে মাছের আবাস নষ্ট হয়েছে।
কৃষকেরা বলেন, “আগে দেখা যেত গ্রামের নীচু জমিতে পলি আসতো, যদি মাটিটা একটু বেলে হতো তবে তার ধরন বুঝে ফসল চাষ করতাম। এখন সেখানে রাস্তা হয়েছে। আমরা যারা গরীব কৃষক আছি তারা সেই বিলের উপর বানানো রাস্তায় গাড়ি চালাই না, ধনীদের গাড়ি চলার জন্য আমরা কৃষির ক্ষতি করছি। কৃষক যদি নিজের ভালো বুঝতো তবে যে পানির সাথে মাছের সম্পর্ক, কৃষির সম্পর্ক, জানলে কৃষক কখনো তা নষ্ট হতে দিতো না”।
ভারতীয় করোনা ভাইরাসের ভ্যারিয়েন্ট সম্পর্কে বলার সময় বক্তা উল্লেখ করেন, ভারতীয় ভ্যারিয়েন্ট দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে তাই এর ভয়াবহতা বেশি। হ্যান্ড স্যানিটাইজার হতে কাপড় ধোয়ার সাবান অথবা ছাই দিয়ে হাত ধোয়ার উপকারীতা বেশী, তার কারন এখানে ক্ষারের মাত্রা বেশী থাকে। যার ফলে COVID-19 ভাইরাসের লিপিড আবরনী নষ্ট হয়ে ভাইরাস ধ্বংস করতে পারে।
তিনি গ্রামের মানুষকে ভাগ্যবান বলে আখ্যায়িত করে বলেন, আপনারা সুর্যের আলো পান, যা আপনাদের দেহে ভিটামিন ডি তৈরীতে সাহায্য করে। আপনারা ভ্যাকসিন ছাড়াই নিরাপদ থাকবেন। প্রত্যেকটি গ্রাম ও পরিবারকে করোনা মুক্ত রাখতে পারলে দেশও করোনা মুক্ত করা যাবে।
কর্মশালার এ পর্যায়ে ''চাতক বাঁচে কেমনে মেঘের বরিষন বিনে'' গানটি গাওয়া হয়। যেখানে স্রষ্টার কাছে জ্ঞান প্রার্থনা করা হয়।
এরপর জনাব ফরহাদ মজহার বলেন, বই পড়েই জ্ঞান অর্জন সম্ভব নয়। এইটা একটা সাধনার ব্যাপার। তাই আমাদের ধর্মগুলোতেও এবাদতের কথা বলা হয়েছে। যার অর্থ দাঁড়ায় জ্ঞান সাধনা করা। জ্ঞান একটা অভিজ্ঞতা লব্ধ অর্জন। যখন কেউ বলে, “আমি অধিক জ্ঞানী এবং তুমি কম জ্ঞানী তাই আমি তোমাকে জ্ঞান দিবো”। তবে সেখানেই পার্থক্য হয়ে যায় এবং এটাই ধ্বংস ও জুলুমের কারন। আপনারা যারা নয়াকৃষি করতেন তাদের সেই প্রথম থেকেই বলেছি, আমরা আপনাদের শেখাতে আসি নাই, আমরা শিখতে এসেছি, আপনাদের কাছে থেকে। আপনার আশেপাশেই জ্ঞানের আধার, আপনারা ¯্রষ্টা প্রদত্ত বিবেক নিয়ে জন্মগ্রহণ করেছেন। ¯্রষ্টা প্রদত্ত বিবেক ব্যবহার করতে হবে। যেটাকে ইসলাম ধর্মের এবাদত বলে সেই একই জিনিসকে সনাতন ধর্মে বলে ধ্যান। কৃষকেরা বেশী উৎপাদনের জন্য ৪০০-৫০০ বছরের পূর্বপূরুষদের রক্ষিত ধানের জাত হারিয়ে ফেলেছেন, অথাৎ কৃষকেরা কৃষি সম্পর্কে সচেতন নয়।
কৃষি কাজ সমম্পর্কে ভ্রান্ত ধারনা: কোম্পানী কৃষককে যে সার বা বীজ দেয় তার সতর্ক বার্তায় তারা বীজের বা সারের ফলাফলের কোন দায় নিতে চায় না। এর মাধ্যমে কোম্পানী তাদের দায়হীনতার পরিচয় দিয়েছে বলে বক্তা দাবী করেন।
প্রকৃত অর্থে কৃষি মানে হলো
১. ফসলের জন্য মাটি তৈরী করা
২. অনুজীবকে এর আহারের জন্য ব্যবস্থা করা
৩. মানুষের স্বাস্থ্য ও পুষ্টির কথা বিবেচনা করা
৪. জ্বালানীর ব্যবস্থা করা যেনো সিলিন্ডার গ্যাস ব্যবহার না করে দেশের অর্থ দেশে রাখা যায়
৫. নির্মাণ সামগ্রীর উপাদান সংগ্রহ
৬. বাসস্থানকে সুন্দর করার জন্য বাগান করা
৭. গৃহপালিত প্রাণীর পালন ব্যবস্থার উন্নয়ন করা যেমন গরু, মুরগী ও মাছ চাষ।
পশুপাখি বলতে গৃহপালিত, আধা গৃহপালিত ও বন্যপ্রাণীদের বুঝায়। এখানে নয়াকৃষি উক্ত উপাদান সমূহের মাঝে সম্পর্ক স্থাপনে কাজ করে। বলা হয় কোন গ্রামে ৩ টি শকুন থাকলে ওখানে খাদ্য খরা হয় না। পাবনা জেলার ঈশ্বরদীতে বীজ সম্পদ কেন্দ্রে দেখা গেছে, ধান শুকানোর সময় ৮-১০ % ধান কবুতর ও অন্যান্য পাখি খেয়ে ফেলে।
ব্রয়লার মুরগী পালন ব্যবস্থা নিয়ে কথা বলেন বক্তা, সেখানে তিনি জানান মুরগী পালন বদ্ধ অবস্থায় করা যাবে না। উদাহরন দিয়ে বলেন, টাঙ্গাইলের নয়াকৃষি কেন্দ্রে প্রায় ৫,০০০ মুরগী আছে কিন্তু তা বুঝা যায় না বাহির থেকে। সেখানে মুরগীর খাদ্য খরচ কম লাগে কারন প্রচুর সম্পুরক খাদ্য সেখানে পাওয়া যায়। তাই প্রতিটা নয়াকৃষি পরিবারে কমপক্ষে ১০০-১৫০ টি হাঁস মুরগী থাকা উচিত।
তিনি দাবী করেন, করোনা মোকাবেলায় নয়াকৃষি উৎপাদিত মুরগীর প্রোটিন সহজেই দেহ গ্রহন করতে পারে ফলে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দ্রুত বৃদ্ধি পায়।
"কৃষি ব্যবস্থা শহরে হয় না", এই ভ্রান্ত ধারনা পরিবর্তনের জন্য তিনি কিছু ছবি প্রদর্শন করেন যেখানে উন্নত দেশগুলো শহর কৃষি ও ছাদ কৃষির চর্চা করেছে। উন্নত দেশগুলোতে দক্ষ জনশক্তির ঘাটতিতে তারা যন্ত্র ব্যবহার করেন। কিন্তু বাংলাদেশ সেই প্রযুক্তি নকল করলে দেশের কৃষি শ্রমিকের জীবিকা সংকটে পড়বে। তাই একটু বেশী সময় লাগলেও দেশীয় দক্ষ শ্রমিকের মাধ্যমেই কাজ করতে হবে।
সরকার পোল্ট্রি খামারের জন্য যথেষ্ট ভর্তুকি দেয়, সেই টাকা কৃষককে দিলে প্রতিটা কৃষকের পরিবারে ৫০০ মুরগী পালন করা সম্ভব যা স্বাস্থ্যকরও বটে ।
প্রতিটি নয়াকৃষি গ্রামে কম্পোষ্ট সারের ব্যবস্থা থাকতে হবে। ভালো কৃষি শিখতে হলে আমাদের বনকে অনুসরন করতে হবে। নয়াকৃষি শুধু মানুষের জন্য নয় বরং অন্যান্য প্রাণীর ও আহার ব্যবস্থা করতে হবে। যখন কোন গ্রামের প্রতি এমন প্রাণীর আকর্ষণ বাড়ে তবে বুঝতে হবে আপনারা ভালবাবে নয়াকৃষি করতে পারছেন। যখন আধুনিক লোকেরা অন্যান্য প্রানীর খাবার বাদ দিয়ে কৃষির কথা বলে তখন তা ধার্মিক দিক থেকেও সাংঘর্ষিক। যখন পশুপাখির আনাগোনা বৃদ্ধি পাবে তখন আপনার কৃষি ব্যবস্থা ও ভালো হবে। যখন দেখবেন বিলে প্রচুর পরিমান পাখি আসে তখন তাদের বর্জ্যরে সাহায্যে প্রচুর শামুক হয়। সেই শামুক হাঁসের খাদ্য হিসেবেও ব্যবহৃত হয়। প্রতিটি নয়াকৃষি গ্রামে মানুষের খাবারের ৪০% খাবার কুড়িয়ে পাওয়া উৎস হতে পেতে হবে।
মানুষ যখন খাদ্যে পরিপূর্ন হবে তথা কৃষিতে সম্বৃদ্ধ হবে তখন তার রাষ্ট্রের খাবারের জন্য অন্যদেশের উপর নির্ভশীল হতে হবে না। তাহলে খাদ্যের সাবভৌমত্ব রাজনৈতিক সাবভৌমত্ব রক্ষায় ভূমিকা রাখে। বর্ষাকালে বৃষ্টির পানির সঠিক ব্যবস্থাপনা করতে পারলে পুর্বের তুলনায় ২-৩ গুন বেশী ফলন পাওয়া যায়। বর্ষায় সমবায় মাছ চাষ করা গেলে সবার লাভ হবে।
ফরিদা আক্তার করোনা মহামারী থেকে বাঁচতে নিয়মিত সাবান বা ছাই দিয়ে হাত ধোয়ার কথা বলেন। নিয়মিত মাস্ক পরিধান ও সামাজিক দূরুত্ব বজায় রাখার পরামর্শ দিলেন। তিনি বলেন, করোনা ভাইরাসের আরেকটি নাম আছে। সেটা হলো কোভিড-১৯। তিনি কৃষকদের উদ্দেশ্যে বলেন, ছোঁয়াচে রোগ ২রকম। ১টি কিভাবে ছড়ায়। উত্তরে কৃষকরো বলেন, জ¦র-সর্দ্বি কাশির, মাধ্যমে ছড়ায়। তিনি আরো বলেন, আরেকটি কঠিন হলেও ছোঁয়াচে না। হাটর এ্যাটাক, ক্যান্সার এসব রোগীর কাছে মানুষ যেতে পারে, রোগীর সেবা করতে পারে। সংক্রমক রোগ গুলো মানুষ হতে মানুষে ছড়িয়ে পড়ে, ফলে মানুষ ভয়ে আক্রান্ত রোগীর সেবা কিংবা মৃত মানুষের সৎকারেও যায়না। আলোচনার এই অংশে তিনি ভারতের করোনা মহামারী এর ভয়ানক অবস্থা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন, ভারতে করোনায় মৃত রোগী সৎকার করতে না পেরে নদীতে ভাসিয়ে দিচ্ছে। করোনা সংক্রমনের উপায় ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন, কথা বলা বা হাচি কাশি দেয়ার সময় অনুজীব হাত বা আশে পাশে লেগে যায়, যা হাতের স্পর্শের মাধ্যমে আমাদের চোখে মুখে বা নাকের মাধ্যমে প্রবেশের পর আক্রান্ত করতে পারে।
এছাড়া পানি খাওয়ার সময় আক্রান্ত ব্যক্তির ব্যবহৃত গ্লাস যদি অন্য কেউ ব্যবহার করেন তবে সংক্রমন ছড়িয়ে পড়তে পারে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
করোনা প্রতিরোধে মাস্ক পড়ার গুরুত্ব জানতে চাইলে খামারীরা উত্তর দেন, বাতাসে ভাসমান করোনার জীবানু যেন নিস্বাসের সাথে মানুষকে আক্রান্ত করতে না পারে।
অষ্ট্রেলিয়ার গবেষনায় দেখা গেছে কাপড় ধোয়ার সাবানে প্রচুর খার থাকায় করোনা প্রতিরোধে অধিক কাযকরী।
Ego ও Eco: নিয়ে কথা বলার সময় তিনি বলেন, বর্তমানের প্রাকৃতিক ব্যবস্থা মানুষ বিমুখ, মানুষ পরিবেশের যতœ না নিয়েই এর ব্যবহার করছে। কিন্তু আমাদের বাস্তুসংস্থান মান মুখী হওয়া উচিত।
দ্বিতীয় অধিবেশনঃ
ফরিদা আখতার বলেন, প্রতিটি নয়াকৃষি গ্রামে বীজ আখড়া থাকতে হবে। সেই পদ্ধতিকে অন্যান্য দেশে "কমিউনিটি সীড ব্যাংক" বলে। বীজ আখড়াতে প্রয়োজনীয় বীজ মজুত থাকবে। যখন যার প্রয়োজন হবে সে সেখান থেকে নিবে এবং পরবর্তীতে আবার ফিরিয়ে দিবে।
জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে তিনি বলেন এখন মৌসুম পরিবর্তন হয়েছে। দীর্ঘমেয়াদী খরা অথবা অসময়ে দীর্ঘস্থায়ী বন্যার জন্য আবাদী কাজের সমস্যা হচ্ছে। তাই এই সমস্যা সমাধানের জন্য ১২ মাসের ফসল পরিকল্পনার কথা বলেন।
এরপর দলে আলোচনার জন্য অংশগ্রহণকারীদের ৪টি দলে ভাগ করা হয়। নারী কৃষকদের ১টি দল এবং পুরুষ কৃষকদের ৩টি দল।
দলীয় আলোচনার জন্য প্রশ্ন সমূহ হলো:
১. বন্যার কারনে যেসব বীজ হারিয়ে গেছে, বা কৃষক বীজ রাখতে পারেন নি, সেটা এবার আমন মৌসুমে কিভাবে সংগ্রহ করা যায়।
২. এক মৌসুমের ফসলের ক্ষতি অন্য মৌসুমে পুষিয়ে নেবার জন্যে কি করা যায়, বা কি ফসল চাষ করা যায় ?
৩. বীজ আখড়া ও বীজ সম্পদ কেন্দ্র ভালভাবে চালাতে হলে কি করা যায়?
৪. জলাবদ্ধতা বা বন্যার পর পানি আটকে গেলে কি করা দরকার
৫. খরা হলে আমরা কি করতে পারি ?
দলীয় আলোচনার বিষয় তুলে ধরা হলোঃ
১. বীজ সম্পদ কেন্দ্র: (ক) অন্যজনের কাছ থেকে, (খ) বীজ কেন্দ্র থেকে, (গ) ধান সংগ্রহ-চামারা ধান, পাটজাগ, কার্তিক জুল ধান, সোনোকরা ধান, (ঘ) নিজেরা বীজ তৈরী করবে
২. রবি ও অর্থকরী ফসল: (ক) অর্থকরী ফসল আবাদ করার পরিকল্পনা - আলু. গম, মরিচ. রসুন, লাল শাক,পালং শাক (খ) রবি ফসল করার জন্য প্রস্তুতি- সরিষা, গম, (গ) দেশী পাট আবাদ
৩. জলাবদ্ধতা ও কালভার্ট: ক. দ্রুত পানি নেমে যাওয়ার স্থানগুলো চিহ্নিত করে কালভার্ট করা
খ. খালের মুখ বড় করে কেটে দিতে হবে গ. চেয়ারম্যানের সাথে সভা করা ঘ. একতা থাকতে হবে
৪. সবজি ও হারিয়ে যাওয়া ধান: সিম, বেগুন, বাধাকপি, ফুলকপি, মিষ্টিআলু, মিশ ্রফসল করতে হবে
৫. কৃষকসভা: ক. পানিতে ফসল চাষ করার পদ্ধতি বিষয়ক কৃষকদের সাথে সভা খ. কৃষক দল গঠন
গ. কৃষকের সাথে আলোচনা সভা করা ঘ. বীজ অভিজ্ঞ কৃষকদের নিয়ে দল তৈরী
৬. সেচ।
৭. খরা সহনশীল ফসল : ক. খরা সহনশীল ফসলের আবাদ যেমন- পাট , তিল। খ. খরা সহনশীল ফসলের জাত সংগ্রহ। গ. খরা সহনশীল আবাদ পরিকল্পনা - আমন + আউশ- মিশ্র আবাদ
৮. বীজ সংগ্রহ: ক. গ্রামে ক্ষতিগ্রস্থ কৃষকদের নিয়ে সভা করার মাধ্যমে বীজের উৎস খোজ করা
খ. বিভিন্ন এলাকায় যেখানে বন্যা কম হয়েছে সেখান থেকে সংগ্রহ
৯. জৈব সার তৈরী।
১০. আলান পালানে সবজি চাষ: বাড়ীর আলান পালানে মিশ্রফসল আবাদ করা বিষয় কৃষকদের সাথে সভা।
এরপর নয়াকৃষির ১০ নীতি নিয়ে আলোচনা করা হয়ঃ
নয়াকৃষির ১০ নীতি:
১. বিষ ব্যবহার বন্ধ করতে হবে
২. কৃষকের হাতে ঘরে ও মাঠে বীজ রাখতে হবে
৩. রাসায়নিক সার ছাড়াই জৈব সার দিয়ে চাষাবাদ করা
৪. সবসময়ই মিশ্রফসল ও শস্যাবর্তনে বাহারী ফসল চাষ করে
৫. আবাদী ও অনাবাদী জায়গার ব্যবস্থাপনা
৬. মাটির ওপরের পানির পরিমিত ব্যবহার
৭. নয়াকৃষি একফসলের হিশাব দিয়ে চাষবাদের সামগ্রিক লাভালাভের হিশাব করে না
৮. প্রাণ, প্রকৃতি আর নিজের ঘরের মধ্যে ব্যবধান মুছে দিয়ে প্রাকৃতিক নিয়মেই গৃহস্থের সামগ্রিক সম্পদ দ্রুত ও নিশ্চিত ভাবে বাড়ানোর সাধনাই নয়াকৃষির নীতি
৯. পানির খবরদারি করা নয়াকৃষির একটি প্রধান নীতি
১০. গ্রামের প্রাকৃতিক সম্পদ বৃদ্ধি করে জীবিকার নিশ্চয়তা বৃদ্ধি ও আয় উন্নতির সুযোগ বাড়ানো নয়াকৃষির নীতি
উপস্থিতি কৃষকদের তালিকা:
১০ বছরের কম ১. রহিমা, ২. মুজিবর রহমান, ৩. তৈরদ্দি, ৪. জুয়েল, ৫. আইন উদ্দীন, ৬. কহিনুর মিয়া
১০-২০ বছরের মধ্যে ৭. লিয়াকত মিয়া, ৮. হাবিবুর রহমান, ৯. ফরমান, ১০. বাবুল হোসেন, ১১. মরিয়ম আক্তার ১২. জোহরা, ১৩. মাহবুবুর রহমান ১৪. শাহজাহান, ১৫. নাজিম উদ্দীন, ১৬. দেলোয়ার হোসেন, ১৭. মো: আবুবক্কর, ১৮ মনজুর আলম।
২০ বছরের উপরে: ১৯. রূপসী বেগম, ২০ আরফান আলী, ২১. মো: সোনা মিয়া
SAS পর্যালোচনা:

সকলের আলোচনার প্রেক্ষিতে এবং গুরুত্বের দিক থেকে ৩টি ঘরে নিম্নের বিষয়গুলি বসানো হয়।
প্রথম ঘরে বসেছে-
বীজ সম্পদ কেন্দ্র- আত্বয়ী-স্বজনের কাছ থেকে এবং বীজ সম্পদ কেন্দ্র থেকে বীজ সংগ্রহ করা, ধান বীজ সংগ্রহ-চামারা ধান, পাটজাগ ধান,কার্তিকঝুল ধান,গণকরায় ধান, নিজেরা বীজ তৈরি করবে, বীজ সম্পদ কেন্দ্রের সাথে সব সময় যোগাযোগ রাখতে হবে, বীজ কমিটির সদস্যদের সাথে সভার মাধ্যমে দেশীয় বীজ সংগ্রহ করে গ্রামে বীজ আখড়ায় দেশীয় বীজ সংগ্রহ করে রাখা, কৃষকের ঘরে বীজ রাখতে হবে, ভাল মানের বীজ সংগ্রহ করে বীজ আখড়ায় জমা রাখতে হবে, বীজ সম্পদ কেন্দ্রে বীজ সম্পদ কেন্দ্রে জমা দিতে হবে, মানসম্মত বীজ নিজেরা সংগ্রহ করে নিজের ঘরে রাখবে, বীজ আখড়া তৈরি করবো, বীজ বিনিময় করতে হবে।
রবি ও অর্থকরী ফসল-অর্থনৈতিক ফসল আবাদ করার পরিকল্পনা-আলু, গম, সরিষা, রসুন, ডাইলে সজ, লালশাক, পালংশাক, রবি ফসল করার জন্য প্রস্তুতি-সরিষা, গম, দেশী পাট আবাদ করা
জলাবদ্ধতা ও কালভার্ট-দ্রুত পানি নেমে যাওয়ার স্থানগুলো চিহ্নিত করে কালভার্ট করা, খালের মুখ বের করে কেটে দিতে হবে, গ্রামের কৃষকসহ ইউপি চেয়ারম্যানের সাথে গ্রামে সভা করা, একতা থাকতে হবে
দ্বিতীয় ঘরে বসেছে-
সবজি ও হারিয়ে যাওয়া ধান, কৃষকসভা-পানিতে ফসল চাষ করার পদ্ধতি বিষয়ক কৃষকদের সাথে সভা, কৃষক দল গঠন, কৃষকদের সাথে আলোচনা সভা করা, বীজ অভিজ্ঞ কৃষকদের নিয়ে দল তৈরি।
দ্বিতীয় ঘরে দাগের উপর বসেছে-
খড়া সহনশীল ফসল-খড়া সহনশীল ফসলের আবাদ যেমন-পাট, তিল, খড়া সহনশীল ফসলের জাত সংগ্রহ করা, খড়া সহনশীল ফসল আবাদ পরিকল্পনা যেমন-আমন/আউশ মিশ্র আবাদ, সেচ-উবিনীগ বীজ সম্পদ থেকে সংগ্রহ করবে, সেচ মেশিন দিয়ে পানি বের করে দিতে হবে,
তৃতীয় ঘরে বসেছে-জৈব সার, কচুরীপানা দিয়ে কম্পোষ্ট তৈরি করা, নদী বা পুকুর থেকে জমিতে সেচ দিতে হবে
তৃতীয় ঘরে দাগের উপর বসেছে-
বীজ সংগ্রহ-গ্রামে ক্ষতিগ্রস্থ কৃষকদের নিয়ে সভা করার মাধ্যমে বীজের উৎস খোঁজ করা, বিভিন্ন এলাকায় যেখানে বন্যা কম হয়েছে সেখান থেকে সংগ্রহ, আলান পালানে সবজী চাষ-বাড়ির আলান পালানে মিশ্র ফসল আবাদ করা বিষয়ে কৃষকদের সাথে সভা।